রাষ্ট্রীয়ভাবে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠিত হলে আসলে সমস্যা কার — ননমুসলিমদের, নাকি অন্য কারো?

রাষ্ট্রীয়ভাবে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠিত হলে আসলে সমস্যা কার — ননমুসলিমদের, নাকি অন্য কারো?

 

প্রিয় পাঠক,
আমরা প্রায়ই একটি দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগি — যদি কোনো দেশে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তাহলে ননমুসলিমরা নিশ্চয়ই সমস্যায় পড়বে, কিংবা তাদের জীবনযাত্রায় বাধা আসবে ।
কিন্তু আসলেই কি বিষয়টি এমন? নাকি এর পেছনে রয়েছে ভিন্ন কোনো বাস্তবতা?
আসুন, আজ আমরা এই বিষয়ে একটি সঠিক ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করি ।

 

🔹 শরিয়াহ বা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার ধারণাঃ

প্রথমেই আমাদের বুঝতে হবে — শরিয়াহ বা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনা বলতে কী বোঝায়?
প্রশ্ন হলো, এখানে কি শুধুই ইসলাম বা মুসলিমদের ধর্মের কথা বলা হচ্ছে? একদমই না ।
ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার ভিন্ন ভিন্ন নীতি রয়েছে (কিছু ব্যতিক্রম । আমি এখানে সকল ধর্মের দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় রেখেই আলোচনা করছি ।

 

🔹 কেন ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র শ্রেষ্ঠ?

আমরা প্রত্যেকেই দুটি বিশ্বাসের মধ্যে একজনের অনুসারী:
1️⃣ স্রষ্টা নেই — অর্থাৎ নাস্তিক
2️⃣ স্রষ্টা আছেন — অর্থাৎ আস্তিক

আজকের আলোচনায় আমরা দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষদের (আস্তিকদের) নিয়েই কথা বলব — অর্থাৎ যারা মুসলিম না হলেও কোনো না কোনো ধর্মে বিশ্বাসী ।

তাহলে একটু ভাবুন — আমরা যাঁকে স্রষ্টা বলে বিশ্বাস করি, তাঁকে কি আমরা মহান, সর্বজ্ঞ, এবং ভুল-ত্রুটিমুক্ত মনে করি না? অবশ্যই করি । যদি তিনি ভুল করেন, তবে তিনি আর স্রষ্টা নন ।

যেহেতু তিনি স্রষ্টা, সেহেতু তিনি সব ক্ষমতার ঊর্ধ্বে, এবং তাঁর তৈরি সবকিছুই নিখুঁত ও সর্বোত্তম — এ বিষয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই । তাহলে আমাদের স্রষ্টা যদি সত্যিই মহান হন, তাঁর প্রেরিত আইন বা ধর্মগ্রন্থের মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালনা করা নিয়ে ভয় বা দ্বিধা থাকার কথা নয়।

কারণ, যদি সেই স্রষ্টা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অবগত থাকেন, তবে তাঁর পাঠানো কিতাব অবশ্যই সব সময়ের জন্য উপযোগী ও কার্যকর হবে।

যদি কেউ দাবি করে — “স্রষ্টার পাঠানো কিতাব আধুনিক যুগে প্রযোজ্য নয়” — তাহলে প্রশ্ন আসে, তিনি কেমন স্রষ্টা, যিনি ভবিষ্যৎ জানেন না!

অতএব, স্রষ্টা যদি সত্যিকারের স্রষ্টা হন, তবে তাঁর পাঠানো ধর্মগ্রন্থ ও তার মধ্যে বর্ণিত শরিয়াহ বা ধর্মীয় আইন সব যুগের জন্যই সর্বোচ্চ পথনির্দেশ।

 

🔹 তাহলে প্রশ্ন থেকে যায় — কোন ধর্মের আইনকে গ্রহণ করা হবে?

এখানে ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক । তবে আমাদের কাজের জায়গা হলো নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করা ।
আমরা প্রতিটি ধর্মের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রযুক্তি ইত্যাদি বিষয় পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পারি — কোন ধর্মের আইন বাস্তব জীবনে সবচেয়ে কার্যকর, ন্যায়সঙ্গত ও মানবিক ফলাফল দিয়েছে ।

এছাড়া, সংশ্লিষ্ট দেশের জনসংখ্যার ধর্মীয় গঠন, সামাজিক প্রেক্ষাপট ও জাতীয় সংস্কৃতিও বিবেচনা করে সেই দেশের জন্য উপযুক্ত ধর্মভিত্তিক নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে ।

 

🔹 উদাহরণ: বাংলাদেশ

ধরা যাক, সব প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে বাংলাদেশে শরিয়াহ আইন (ইসলামি আইন) বাস্তবায়িত হলো । তাহলে প্রশ্ন উঠবে — এই দেশে ননমুসলিমদের ভূমিকা কী হবে?

 

🔹 শরিয়াহ আইন ও ননমুসলিমদের অবস্থানঃ

শরিয়াহ ইসলামি বিশ্বাসের ভিত্তিতে গঠিত — অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম ও রাসূল ﷺ এর নির্দেশ অনুসারে জীবন পরিচালনা করা । এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাহলে এখানে ননমুসলিমদের অবস্থান কী হবে?

আসুন, আমরা কুরআনের আলোকে বিষয়টি দেখি।

“ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই…”
— (সূরা আল-বাকারা, ২:২৫৬)

📖 ব্যাখ্যা:

ইসলামী শরিয়াহ কোনো মানুষকে জোর করে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করে না । ননমুসলিমরা তাদের নিজ নিজ ধর্ম অনুযায়ী উপাসনা, বিবাহ, খাদ্যাভ্যাস ও সামাজিক জীবনে সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকবে।
শুধু রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, কর ব্যবস্থা, ও ন্যায়বিচারের কাঠামো ইসলামী নীতির ওপর পরিচালিত হবে — যা সবার জন্যই ন্যায়সঙ্গত ও কল্যাণকর ।

অর্থাৎ দেখা গেল, শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠিত হলেও একজন ননমুসলিমের ধর্মপালনে কোনো প্রকার বাধা সৃষ্টি হয় না ।

 

🔹 উপসংহার

সব আলোচনার মাধ্যমে আমরা স্পষ্টভাবে দেখতে পাই — শরিয়াহ আইন ননমুসলিমদের জন্য কোনো হুমকি নয়; বরং এটি ন্যায়, সমতা ও মানবিকতার সর্বোচ্চ প্রতিফলন ।

হ্যাঁ, কেউ যদি ভুল বুঝে শরিয়াহ আইন প্রত্যাখ্যান করে, কিন্তু কেউ যদি সঠিকভাবে বুঝেও শরিয়াহ আইনকে প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে সে আসলে ননমুসলিম নয় — বরং নাস্তিক বা স্রষ্টায় অবিশ্বাসী ।

আজকের মতো এখানেই আলোচনা শেষ করছি।
আসসালামু আলাইকুম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *